বিশ্বাস সন্দেহ আর গর্ভবতী এক স্ত্রীর অস্থির সকাল।
আজকের সকালটা আমার কাছে আর পাঁচটা সকালের মতো ছিল না। আমি গর্ভবতী, চার মাস চলছে। প্রতিদিনের মতো আজও আমি উঠে আমার হাজব্যান্ডের জন্য অফিসের খাবার প্রস্তুত করছিলাম। কিন্তু সে হঠাৎ বলল, “আজকে খাবার দিতে হবে না, এক স্যার খিচুড়ি আনবেন, কয়েকজনকে খাওয়াবেন।”
আমি একটু অবাক হলাম। অফিসে খাওয়ার জন্য কোনো স্যার খিচুড়ি আনবেন — হুট করে সকালবেলা এমনটা জানানোটা আমার কাছে কিছুটা অস্বাভাবিক লাগল। আমি জানতে চাইলাম, “কি উপলক্ষে?” সে বলল, “এমনি।”
এমনকি যেই স্যার আনছেন, তার নামও সে বলতে পারল না। আমি বললাম, “কীভাবে জানাইছে?” তখন সে প্রথমে বলল, কল দিয়ে জানিয়েছে। পরে বলল, না, এক আপা বলেছে। আমি তখন একটু জেরা করতেই সে বলে দিলো, মেসেঞ্জারে বলেছে ওই আপা।
এখানেই আমার সন্দেহ আরও গাঢ় হয়। আমি বললাম, দেখি তো কোথায় বলেছে। তখন সে তার মেসেঞ্জার খুলে ওই আপার আইডি বের করে। কিন্তু সেখানে কোনো মেসেজ তো নেই, এমনকি আগের কোনো কথোপকথনও নাই! আমি জিজ্ঞেস করলাম, “এই আপাই যদি জানাইছে, তাহলে তার মেসেজ কোথায় গেল?” সে উত্তর দিল, ডিলিট হয়ে গেছে।
এখানেই আমার বুকের মধ্যে ধক করে একটা কিছু উঠল। আমি জানি, সে নামাজ পড়ে, একজন ভালো মানুষ হিসেবেই পরিচিত। আমরা প্রায়ই একে অপরের ফোন দেখি, কখনোই কিছু লুকোচুরি পাইনি। কিন্তু আজকে কেন এত অসঙ্গতি?
আমি খেয়াল করলাম, ওই মহিলা তার ফেসবুক ফ্রেন্ডলিস্টে আছে, এবং তারা সহকর্মী। কিন্তু কখনো তাদের কথাবার্তা দেখিনি। আজ হঠাৎ এমন খিচুড়ি ইস্যুতে তার মেসেজ থাকল না? অথচ অন্য সবার মেসেজ ফোনে রয়ে গেছে। তাহলে শুধু এই একজনের মেসেজ সে ডিলিট করেছে কেন?
এমনকি আমি দেখলাম, যখন আমি পাশে ছিলাম তখন সে নিজেই ঐ আপার আইডিতে গিয়ে ফোন দিল, যেন আপনি কিছু দেখতে না পান — সেটাও তো চিন্তার বিষয়! স্বাভাবিকত, কলিগদের সাথে ছোটখাটো কথাবার্তা হতেই পারে। কিন্তু এমন যদি হয়, যেখানে প্রতিবার কথার পরপরই মেসেজ ডিলিট করা হয়, তাহলে সন্দেহ তো হবেই।
সত্যি বলতে, আমার মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। সন্দেহ করাটা আমার স্বভাবে নেই, বিশেষ করে তার প্রতি আমি বরাবরই বিশ্বাস রেখে এসেছি। কিন্তু আজকের মতো এমন অস্বচ্ছ অবস্থানে আমি আগে কখনো পড়িনি।
তাহলে এখন প্রশ্ন হলো — আমি কি ভুল ভাবছি?
আমার চোখে আজ যেসব জিনিস এসেছে তা সবই যুক্তিযুক্ত সন্দেহের জন্ম দেয়:
- অফিসের কেউ হুট করে খিচুড়ি আনবে বলেছে, কিন্তু কোনো প্রমাণ নেই।
- যে কলিগ জানায়ছে, তার কোনো মেসেজ, কল, রেকর্ড কিছুই নেই।
- সেই আইডিতে কোনো কথাবার্তার ইতিহাস নেই, অথচ সহকর্মী হিসেবে অন্তত কিছু কথা থাকার কথা।
- শুধু এই একজনের মেসেজই ডিলিট করা — কেন?
- মিথ্যা কথা বলছে একাধিকবার, প্রথমে বলল স্যার জানাইছে, পরে বলল আপা বলেছে — এই অসঙ্গতি তো একটুও স্বাভাবিক নয়।
আমি কি হঠাৎ করে সন্দেহ করে ফেলেছি? না, এটা আমার নিজের চোখে দেখা কিছু আচরণ, কিছু গড়মিল, যা আমার মতো একজন স্ত্রীকেও সন্দেহ করতে বাধ্য করে।
আমি এখন গর্ভবতী — মানসিক চাপ আমার ও সন্তানের ক্ষতি করতে পারে
এই সময়টা আমার জীবনের সবচেয়ে সংবেদনশীল একটি সময়। শরীরের ভেতরে পরিবর্তন, হরমোন, আবেগ — সব কিছু মিলে মন হয়ে থাকে খুব নরম ও দুর্বল। তাই যদি স্বামীর উপর এমন একটা চিন্তা মাথায় ভর করে, তাহলে সেটা স্রেফ দুশ্চিন্তা না — সেটা আমার সন্তানের স্বাস্থ্যেও প্রভাব ফেলতে পারে।
আমি সকাল থেকে কিছুই খেতে পারছি না। মাথার মধ্যে শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরছে — আসলে খিচুড়ি আনছে কে? মহিলা না স্যার?
আর বড় প্রশ্ন — আমার স্বামী কি কিছু লুকোচ্ছে?
এখন আমি কী করতে পারি?
১. প্রথমেই আমি ধৈর্য ধরব
এখন যদি আমি ঝগড়া করি, রাগ করি — তাতে সত্য বের হবে না, বরং পরিস্থিতি খারাপ হবে। তাই ধৈর্য নিয়ে কিছুদিন তাকে পর্যবেক্ষণ করব।
২. আচরণে পরিবর্তন খেয়াল করব
তার ব্যবহার, ফোন ব্যবহার, অপ্রয়োজনীয় গোপনীয়তা — এসব কিছু খেয়াল করব, যেন পরবর্তী সময়ে প্রশ্ন করার মতো কিছু প্রমাণ থাকে।
৩. একবার সরলভাবে কথা বলব
গর্ভবতী অবস্থার দোহাই দিয়ে বলব, “আজকে তোমার কথাগুলো শুনে আমার ভিতরটা খুব অস্থির হয়ে গেছে। তুমি যদি কিছু লুকিয়ে থাকো, সেটা আমাকে আরও বেশি ভেঙে দেবে। আমি চাই তুমি যদি সত্যিই নির্দোষ হও, তবে আমাকে সত্যিটা বলে আশ্বস্ত করো।”
৪. কাউকে বিশ্বাসযোগ্য কাউকে বলব
হয়তো মায়ের কাছে, অথবা বড় বোন বা ঘনিষ্ঠ কারো সাথে বিষয়টা ভাগ করে নেব। তারা বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে ভালো পরামর্শ দিতে পারবেন।
শেষ কথা
বিশ্বাস যখন ভাঙতে শুরু করে, তখন সন্দেহের ভিত গড়ে ওঠে। তবে প্রতিটি সন্দেহ মানেই প্রতারণা না। আবার প্রতিটি ভালো আচরণ মানেই সম্পূর্ণ নির্দোষতাও নয়। তাই আপনাকে এখন চোখ খুলে রাখতে হবে, কিন্তু হৃদয় বন্ধ করে ফেললে চলবে না।
আপনি একা নন। আপনি একজন সাহসী স্ত্রী, একজন মা হতে চলেছেন। এখন সময় আবেগে ভেসে যাওয়া নয়, বরং বাস্তবতা যাচাই করে সামনের পথ বেছে নেওয়ার।