রক্তঋণে কেনা ভোর
রক্তের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের প্রিয় স্বাধীনতা।
নিস্তব্ধতার চাদরে ঢাকা।
সেদিন ছিল বৃহস্পতিবার, ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ। ফাল্গুনের হালকা হাওয়া বইলেও ঢাকার আকাশটা বিকেল থেকেই কেমন যেন থমথমে হয়ে ছিল। চারদিকে এক অদ্ভুত গুমোট ভাব, যেন প্রকৃতিও আসন্ন কোনো বড় বিপদের পূর্বাভাস দিচ্ছিল। রমনা রেসকোর্স ময়দান থেকে শুরু করে পুরান ঢাকার অলিগলি—সর্বত্রই ছিল চরম উত্তেজনা ও অস্থিরতা। কিন্তু সেই অস্থিরতার মাঝেও কেউ কল্পনা করতে পারেনি যে, সভ্যতার ইতিহাসে এক কলঙ্কিত ও ভয়াল অধ্যায় রচিত হতে যাচ্ছে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে।
অপারেশন সার্চলাইট: যখন সভ্যতা থমকে গেল
রাত সাড়ে ১১টা। পুরো ঢাকা শহর তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। হঠাৎ নিস্তব্ধতা ভেঙে গর্জে উঠল ভারী ট্যাঙ্কের চেইন আর বুটের শব্দ। রাজারবাগ পুলিশ লাইনস, পিলখানা আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা লক্ষ্য করে ধেয়ে এল আধুনিক মারণাস্ত্র সজ্জিত একদল নরপিশাচ। নাম দেওয়া হলো অপারেশন সার্চলাইট। এটি কোনো সাধারণ সামরিক অভিযান ছিল না। এটি ছিল এক সুপরিকল্পিত ও নৃশংস গণহত্যার নীল নকশা।
নীলক্ষেত ও রোকেয়া হলের হাহাকার
সবচেয়ে নৃসংস ও পৈশাচিক হামলাটা হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। ছাত্রাবাসগুলোতে তখন মেধাবী ছাত্ররা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। জগন্নাথ হল আর ইকবাল হলে (বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) যেভাবে ব্রাশফায়ার করা হলো, তাতে দেওয়ালগুলো মুহূর্তেই ঝাঁঝরা হয়ে গেল, রক্তে ভিজে একাকার হয়ে গেল মেঝে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের পিঠস্থান মুহূর্তেই পরিণত হলো এক বিভীষিকাময় কসাইখানায়।
একটি পরিবারের শেষ মুহূর্ত
আজাহারের ছোট বোন তুলি ভয়ে কুঁকড়ে বাবার হাত ধরে বসে ছিল। বাবা নির্বাক, বিড়বিড় করে দোয়া পড়ছিলেন। আজাহার তার পুরনো ট্রাঙ্ক থেকে একটা লাঠি বের করে আনল। সে জানত, এই সাধারণ লাঠি দিয়ে আধুনিক ট্যাঙ্কের মোকাবিলা করা অসম্ভব, কিন্তু তার রক্তে তখন ফুটছিল পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার তেজ। হঠাৎ তাদের দরজায় প্রচণ্ড আঘাত পড়ল। দরজা ভেঙে যখন সশস্ত্র সৈন্যরা ভেতরে ঢুকল, আজাহার বাধা দিতে চাইল। কিন্তু রাইফেলের বাঁটের প্রচণ্ড আঘাতে তাকে মেঝেতে ফেলে দেওয়া হলো। তাঁর চোখের সামনেই বৃদ্ধ বাবাকে টেনে হিঁচড়ে বাইরে নিয়ে যাওয়া হলো।
আগুনের লেলিহান শিখা ও গণকবর
পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার আর তাঁতীবাজার এলাকায় পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হলো। সারিবদ্ধ দোকানপাট আর মানুষের বসতবাড়ি দাউ দাউ করে জ্বলছিল। ড্রেনগুলো দিয়ে তখন প্রবাহিত হচ্ছিল মানুষের লাল রক্ত। সকালের আলো যখন ফুটল, তখন ঢাকা আর আগের ঢাকা নেই। রাস্তার মোড়ে মোড়ে পড়ে আছে অগণিত লাশ। শহীদদের রক্তে রঞ্জিত হলো বাংলার মাটি। সেই মাটি থেকেই সেদিন জন্ম নিয়েছিল এক অমোঘ জেদ—আমাদের মুক্ত হতে হবে।
শোক থেকে শক্তিতে রূপান্তর: স্বাধীনতার উদয়
২৫শে মার্চের সেই বিভীষিকা বাঙালিকে কেবল ভয়ই দেখায়নি, বরং ঘুমন্ত ও শান্ত জাতিকে এক লহমায় জাগিয়ে দিয়েছিল। আজাহার সেই ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে শপথ করেছিল, এই রক্তের বদলা সে নেবেই। শহীদদের আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি; তাঁদের রক্তের বিনিময়েই আমরা পেয়েছি এক স্বাধীন মানচিত্র, এক লাল-সবুজের পতাকা। ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে যখন স্বাধীনতার চূড়ান্ত ঘোষণা এল, তখন সেই ঘোষণায় ধ্বনিত হচ্ছিল ২৫শে মার্চের শহীদদের না বলা শেষ আকুতি।
উপসংহার: অমর হোক স্বাধীনতা
আজ যখন আমরা স্বাধীন মানচিত্রে বুক ভরে শ্বাস নিই, তখন যেন একবারের জন্য হলেও মনে করি সেই ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের ভয়াল কালরাতকে। শহীদদের আত্মত্যাগই আমাদের এই স্বাধীন অস্তিত্বের ভিত্তি। তাঁদের অকুতোভয় প্রাণদের প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা।
5 Comments on রক্তঋণে কেনা ভোর