বৃষ্টির দিনে রিকশা ভাড়া শুনলেই মনে হয় বিয়ের গেট ধরা হয়ছে।
—জীবনের সবচেয়ে বড় দর-কষাকষি হয় ছাতা মাথায়, রিকশার ছাদ ছাড়া।
ঢাকার আকাশটা সকাল থেকেই কেমন যেন গম্ভীর হয়ে আছে। মেঘে মেঘে ঢাকা, বাতাসে ঠাণ্ডা সোঁদা গন্ধ। রিমঝিম বৃষ্টি শুরু হতেই নাভিদ হঠাৎ ফোনে চিৎকার করল,
—দোস্ত, আয় রে! আজকে রেইন ডে আউট! সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে চা-পেঁয়াজু দিবি?
তারেক তখন বিছানায় কম্বলের নিচে ঘুমে ঢলছিল। এমন দিনে বের হওয়া মানেই একপ্রকার বীরত্ব, তাও বন্ধুর ডাকে সাড়া না দিয়ে উপায় নেই।
পাঁচ মিনিট পর তারেক ছাতা হাতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে। একটা রিকশা থামিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—ভাই, শাহবাগ যাবেন?
রিকশাওয়ালা ছাতা মাথায় দিয়ে উত্তর দিল,
—যাব, দুইশো টাকা।
তারেক চোখ বড় করে বলল,
—ভাই! শাহবাগ তো এখান থেকে মাত্র ১৫ মিনিটের রাস্তা!
রিকশাওয়ালা যেন চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা গেটম্যান, বলল,
—ভাই, বৃষ্টি দিন। টায়ার পিছলায়। রাস্তায় জ্যাম। আমিও ভিজি। দুইশো কম হইব না।
তারেক হাসতে হাসতে বলল,
—এই তো আসল বিয়ের গেট! আমি বরপক্ষ, আপনি কনেপক্ষ। এবার শুরু হোক দর-কষাকষি!
তারা এমন করে দর হাঁটাহাঁটি করছিল, যেন সত্যিকারের কনে আনতে যাচ্ছে। শেষে রিকশাওয়ালা হাল ছেড়ে বলল,
—আচ্ছা ভাই, দে ১৫০, তবে ছাতা আপনিই ধরবেন।
রিকশায় চড়ে তারেক ফোন করল নাভিদকে,
—দোস্ত, জানিস! এই রিকশাওয়ালার ভাড়া শুনে মনে হল আমি যেন বিয়ের গেট পার হচ্ছি। ও বলছে, ছাতা আপনি ধরবেন। হাহ!
উদ্যানে পৌঁছে তারা চা, পেঁয়াজু, ভেজা ঘাস আর একরাশ হালকা ঠান্ডা বাতাসের মাঝে বসে গরম গল্প করছিল। চারপাশে প্রেমিক জুটি, শিশুদের হৈচৈ, ছাতার নিচে বুক জোড়া করা মানুষ। কিন্তু তারেক-নাভিদ ছিল ছাতার বাইরে, ভেজা বেঞ্চে। কারণ তারা বাজেটের ভাড়া দিয়ে ছাতাটাই ভাগ করে নিতে পারেনি!
নাভিদ বলল,
—এই শহরে বর্ষা মানেই রোমান্টিকতা না, ভাড়ার দুঃস্বপ্ন।
তারেক মুচকি হেসে বলল,
—আর বৃষ্টির দিনে রিকশা ভাড়া মানেই বিয়ের গেটের শাস্তি!
চায়ের কাপ শেষ হতে না হতেই আবার টুপটাপ বৃষ্টি। ফেরার সময় আরেক রিকশা থামিয়ে তারা বলল,
—আজিমপুর যাবেন?
রিকশাওয়ালা মাথা নাড়ল,
—যামু, তিনশো দিবেন।
নাভিদ হেসে বলল,
—ভাই, কনের মামারা রাগ করে চলে যাবে, একটু কমান।
রিকশাওয়ালা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
—তাহলে হেঁটেই যান ভাইজান, কনের বাসা দূর না।
শেষমেশ পেছনের সিটে বসে তারেক বলল,
— দোস্ত, আজ বুঝলাম, প্রেম করে মানুষ বিয়ে করতে পারে। কিন্তু রিকশার ভাড়া? সেটা দর কষাকষির এক অন্যরকম বিয়ে!
নাভিদ জবাব দিল,
—আর কনের জায়গায় বসে থাকে রিকশাওয়ালা!
বৃষ্টিভেজা শহর আবারও তাদের দুজনকে হাসির মাঝে ভিজিয়ে দিল। আর পেছনে পড়ে রইল সেই বিয়ের গেটের মতো ভাড়া— যা শেষ পর্যন্ত না দিয়ে উপায় নেই।